ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৩, ১৮ মাঘ ১৪২৯

শেষ জুটিতে মুস্তাফিজ-মিরাজের অবিচ্ছিন্ন ৫১ রানের জুটিতে হারের মুখ থেকে জয় আদায় করে নিল বাংলাদেশ।

শেষ জুটিতে ভারতের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় এক জয় উপহার দিলো মিরাজ

ক্রীড়া ডেস্ক | প্রকাশিত: ৪ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩:০৩; আপডেট: ৩১ জানুয়ারী ২০২৩ ১৫:৩৭

 

প্রতিপক্ষের শেষ জুটিতে জিততে থাকা ম্যাচে অনেক বারই হারতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। কিন্তু সকল জল্পনা-কল্পনাকে উড়িয়ে দিয়ে, মেহেদী মিরাজ সাহসী আর বুদ্ধিমত্তার এক ব্যাটিংয়ে মোস্তাফিজকে সাথী করে শেষ জুটিতে হারতে থাকা ম্যাচকে ভারতের হাত থেকে ছিনিয়ে বাংলাদেশকে এক অবিস্মরণীয় জয় উপহার দিলো। 

গ্যালারি ঠাসা দর্শকের প্রায় অর্ধেকই ততক্ষণে মাঠ ছেড়ে গেছেন। তাতে কী, গর্জনের জোর কম নয় একটুও। মাঠে যারা ছিলেন, তাদের চিৎকারে প্রকম্পিত চারপাশ। অপেক্ষা তখন কেবল একটি রানের। দিপক চাহারের বল কাভারের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে সেই রানটি নিয়ে মেহেদী হাসান মিরাজ ডানা মেলে দিলেন। একটু পর হারিয়েও গেলেন সতীর্থদের মানব বৃত্তে। কিছুক্ষণ পর তাকে দেখা গেল শূন্যে, সতীর্থদের কাঁধে! রূপকথার মতো এক জয়ের নায়ক তিনি। তাকে ঘিরেই তো হবে উৎসব!

অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়, অভাবনীয় কিংবা এরকম আরও অনেক বিশেষণই ব্যবহার করা যায়। তবু হয়তো বোঝানো কঠিন পুরোপুরি। এমন এক জয়ই বাংলাদেশের ক্রিকেটকে উপহার দিলেন মিরাজ ও মুস্তাফিজুর রহমান। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, উত্তেজনা আর রোমাঞ্চে ভেসে দুজন সম্ভব করে তুললেন প্রায় অসম্ভবকে। ভারতকে ১ উইকেটে হারিয়ে সিরিজে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।

ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনার মধ্যেও রোববার মিরপুরে ছিল ক্রিকেটের জোয়ার। ম্যাচ শুরুর অনেক আগে থেকেই মাঠের চারপাশে জনস্রোত। অনেক দিন পর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভরে ওঠে পুরোপুরি। তবে বাংলাদেশের রান তাড়ায় ব্যাটিং বিপর্যয়ের মধ্যে মাঠ ছেড়ে যান অনেকেই। দলের পরাজয় অনেকটা নিশ্চিত জেনেও যারা থেকে যান গ্যালারিতে, তারা স্বাক্ষী হন সারা জীবন গল্প করার মতো এক অভিজ্ঞতার।

সাকিব আল হাসানের রেকর্ড গড়া ৫ উইকেট আর ইবাদত হোসেনের ৪ উইকেটে ভারতের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন আপ থমকে যায় ১৮৬ রানে। সেই রান তাড়ার মাঝপথে গিয়ে ধস নামে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন আপে। ৮ রানের মধ্যে ৫ উইকেট হারিয়ে পরাজয়ের দুয়ারে চলে যায় তারা। শেষ বাটসম্যান মুস্তাফিজ যখন উইকেটে সঙ্গী হন মিরাজের, জয় তখনও ৫১ রান দূরে।

পরাজয়ের সেই চোখরাঙানিকেই অসাধারণ জয়ের অনির্বচনীয় আনন্দে রূপ দেন তারা দুজন। ভয়ডরহীন ক্রিকেটে দারুণ সব শট খেলেন মিরাজ। তাকে দারুণভাবে সঙ্গ দিয়ে মহামূল্য কিছু রান আদায় করে নেন মুস্তাফিজ। এই যুগলবন্দিতে জয় ধরা দেয় ৪ ওভার বাকি রেখেই।

 

সাতে নেমে ৪ চার ও ২ ছক্কায় ৩৯ বলে ৩৮ রানে অপরাজিত মিরাজ। ১১ বলে অপরাজিত ১০ মুস্তাফিজের। সংখ্যায় যা লেখা আছে, তাদের রান আসলে এর চেয়েও অনেক মূল্যবান। সাহস, হার না মানা মানসিকতা ও জয়ের চাদরে মোড়ানো প্রতিটি রান।

ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের তৃতীয় ১ উইকেটের জয় এটি। সফল রান তাড়ায় এই জুটি শেষ উইকেটে দেশের রেকর্ড। ২০০৯ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রামে নাঈম ইসলাম ও নাজমুল হোসেনের ৩৫ রানের জুটি ছিল আগের রেকর্ড।

মিরপুরের উইকেট বরাবরের মতোই ছিল মন্থর। বল থমকে আসে ব্যাটে। স্পিনারদের জন্য টার্ন ও বাউন্স মেলে শুরু থেকেই। পেসারদের বলে শট খেলাও ছিল কঠিন। এই উইকেটেই দেখা যায় ধ্রুপদি এক লড়াই।

বাংলাদেশের রান তাড়ার শুরুটাই হয় বাজে। ইনিংসের প্রথম বলেই স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন নাজমুল হোসেন শান্ত।

ভারতীয় পেসারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ে লিটন দাস ও এনামুল হক স্বস্তিতে খেলতে পারেননি একটুও। শুরু থেকেই তাই ইনিংস ছিল গতিহারা। এনামুলের ইনিংস থামে ২৯ বলে ১৪ রানে।

সাকিব নামার পর একটু গতি আসে ইনিংসে। বোলিংয়ের তরতাজা সাফল্যকে সঙ্গী করে অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার ব্যাটিংয়েও দলকে এগিয়ে নেন অনেকটা। সময়ের সঙ্গে আত্মবিশ্বাস ফিরে পান লিটনও। গড়ে ওঠে জুটি।

দুজনের কেউই অবশ্য কাজটা শেষ করতে পারেনি। লেগ স্টাম্পের বাইরে আলসে এক শটে লিটনের ইনিংস থামে ৪১ রানে। দারুণ খেলতে থাকা সাকিব ২৯ রানে বিদায় নেন শর্ট কাভারে বিরাট কোহলির দারুণ ক্যাচে।

শঙ্কার কালো মেঘ তখন উঁকি দিলেও ঘনীভূত হয়নি। মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ যে তখনও ছিলেন। দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান অবশ্য ভুগতে থাকেন বেশ। তবে উইকেট হারাননি অনেকক্ষণ। থিতু হওয়ার পর যখন ইনিংস বয়ে নেওয়ার পালা, তখনই দলকে বিপদে ঠেলে রণে ভঙ্গ দিয়ে ফেরেন দুজনই। দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মিলে ৮০ বল খেলে করতে পারেন স্রেফ ৩২ রান।

ইনিংসের মড়কও লাগে তখন। একের পর এক ব্যাটসম্যানের বিদায়ে ৪ উইকেটে ১২৮ থেকে চোখের পলকে বাংলাদেশের রান হয়ে যায় ৯ উইকেটে ১৩৬। পরাজয় মনে হচ্ছিল স্রেফ সময়ের ব্যাপার।

কিন্তু সেই সময়কেই থমকে দেন মিরাজ ও মুস্তাফিজ। দলকে এনে দেন অসাধারণ জয়।

ম্যাচের প্রথম ভাগে ছিল সাকিব-ইবাদত শো। বাংলাদেশের সবসময়ের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে অনেক আগেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সাকিব আরও একবার চেনান নিজের জাত। ৮ মাসের বেশি সময় পর ওয়ানডে খেলতে নেমে তার শিকার ৩৬ রানে ৫ উইকেট। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এই স্বাদ পেলেন তিনি চতুর্থবার। ভারতের বিপক্ষে আগে ৪ উইকেটও ছিল না তার।

টেস্ট দলের নিয়মিত পেসার ইবাদত ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নেমেই দেখা পান ৪ উইকেটের।

ভারতের টপ ও মিডল অর্ডারের অন্যদের ব্যর্থতাই একাই লড়াই করে লোকেশ রাহুল খেলেন ৭০ বলে ৭৩ রানের ইনিংস।

ওয়ানডে নেতৃত্বের অভিষেকে টস জিতে ভারতকে ব্যাটিংয়ে পাঠান লিটন দাস। নতুন বলে মুস্তাফিজুর রহমান ও হাসান মাহমুদ শুরু করলেও তৃতীয় ওভারেই মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিন আক্রমণে আনেন অধিনায়ক। প্রথম সাফল্যও আসে তার হাত ধরে।

কিছুটা ধীরগতির শুরুর পর পঞ্চম ওভারে মিরাজকে রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বল স্টাম্পে টেনে আনেন শিখর ধাওয়ান (১৭ বলে ৭)।

পরের ওভারে হাসানকে ছক্কা মেরে পাল্টা আক্রমণের ইঙ্গিত দেন রোহিত শর্মা। পরের তিন ওভারেও বাউন্ডারি আসে ভারতীয় অধিনায়কের ব্যাট থেকে। তাতে শুরুর ধাক্কা অনেকটাই সামাল দেয় ভারত। কিন্তু বল হাতে নিয়েই আবার চিত্র পাল্টে দেন সাকিব। প্রথম ওভারেই বিদায় করে দেন তিনি রোহিত ও বিরাট কোহলিকে!

প্রথমটি অসাধারণ ডেলিভারিতে, পরেরটি লিটনের চোখধাঁধানো ক্যাচে। রোহিত (৩১ বলে ২৭) বুঝতেই পারেননি সাকিবের আর্ম ডেলিভারি। স্পিন করবে ভেবে ব্যাট পেতে দেন তিনি, সাকিবের স্লাইডার ব্যাট-প্যাডের ফাঁক দিয়ে ছোবল দেয় স্টাম্পে।

এক বল পরই আরেক জোর ধাক্কা ভারতের। সাকিবের ঝুলিয়ে দেওয়া ডেলিভারিতে বিভ্রান্ত কোহলি (১৫ বলে ৯) টাইমিং করতে পারেনি ঠিকমতো। শর্ট কাভারে ডান দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত রিফ্লেক্স ক্যাচ নেন লিটন।

এরপর ইনিংস মেরামতের পালা। শ্রেয়াস আইয়ারকে নিয়ে সেই চেষ্টা চালিয়ে যান রাহুল। শুরু থেকেই তিনি ছিলেন সাবলিল। ক্রিজে যাওয়ার পরপরই সুইপে ছক্কা মারেন সাকিবকে।

শ্রেয়াসের জন্য পরিকল্পনা ছিল শর্ট বল। একের পর এক শর্ট বল করে যান ইবাদত। তাতে সফলও হন এক পর্যায়ে। মুশফিকুর রহিমের হাতে ধরা পড়ে বিদায় নেন এ বছর ওয়ানডেতে দুর্দান্ত ফর্মে থাকা ব্যাটসম্যান। ৩৯ বলে ২৪ রান করে তার বিদায়ে ভাঙে ৪৩ রানের জুটি।

ইনিংসের একমাত্র অর্ধশত রানের জুটি এরপরই পায় ভারত। পঞ্চম উইকেটে ৬০ রান যোগ করেন রাহুল ও ওয়াশিংটন সুন্দর। এই জুটি অবশ্য থামতে পারত আরও আগেই। কিন্তু ১২ রানে মিরাজের বলে ওয়াশিংটনের ক্যাচ ছাড়েন ইবাদত।

নতুন স্পেলে ফিরে সেই জুটি ভাঙেন সাকিব। রিভার্স সুইপ করে সহজ ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ১৯ রান করা ওয়াশিংটন।

এরপর শাহবাজ আহমেদকে রানের খাতা খুলতে দেননি ইবাদত। সাকিব এক ওভারে শার্দুল ঠাকুর ও দিপক চাহারকে ফিরিয়ে পূর্ণ করেন ৫ উইকেট।

স্রোতের বিপরীতে তবু লড়াই চালিয়ে যেতে থাকেন রাহুল। তার ৫ চার ও ৪ ছক্কার ইনিংস শেষ পর্যন্ত থামান ইবাদত। শেষ উইকেটও নেন এই পেসারই। ভারতের ইনিংস শেষ হয় ৫২ বল আগেই।

তখনও বোঝা যায়নি, কত নাটকীয়তা জমা রেখেছে এই ম্যাচ। রান তাড়ায় নানা মোড় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা দেয় বাংলাদেশের রোমাঞ্চকর জয়।

এই ধরনের ম্যাচ বাংলাদেশ কত হেরেছে, কতবার রচিত হয়েছে হৃদয় ভাঙার অধ্যায়ের। এই তো, কদিন আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই ভারতের কাছেই হারতে হয়েছে জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়েও। অবশেষে এবার অভাবনীয় জয়ের উল্টো স্রোতের দোলা। 

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

ভারত: ৪১.২ ওভারে ১৮৬ (রোহিত ২৭, ধাওয়ান ৭, কোহলি ৯, শ্রেয়াস ২৪, রাহুল ৭৩, ওয়াশিংটন ১৯, শাহবাজ ০, শার্দুল ২, চাহার ০, সিরাজ ৯, কুলদিপ ২*;

বোলিং-(বাংলাদেশ): মুস্তাফিজ ৭-১-১০-০, হাসান ৭-১-৪০-০, মিরাজ ৯-১-৪৩-১, সাকিব ১০-২-৩৬-৫, ইবাদত ৮.৪-০-৪৭-৪)

বাংলাদেশ: ৪৬ ওভারে ১৮৭/৯ (লিটন ৪১, শান্ত ০, এনামুল ১৪, সাকিব ২৯, মুশফিক ১৮, মাহমুদউল্লাহ ১৪, আফিফ ৬, মিরাজ ৩৮*, ইবাদত ০, হাসান ০, মুস্তাফিজ ১০*;

বোলিং-(ভারত): চাহার ৮-১-৩২-১, সিরাজ ১০-১-৩২-৩, কুলদিপ ৫-০-৩৭-২, শাহবাজ ৯-০-৩৯-০, ওয়াশিংটন ৫-০-১৭-২, শার্দুল ৯-১-২১-১)

ফল: বাংলাদেশ ১ উইকেটে জয়ী

সিরিজ: ৩ ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে

ম্যান অব দা ম্যাচ: মেহেদি হাসান মিরাজ




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top