ঢাকা বৃহঃস্পতিবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২১, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮

লোকমান হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর, থমকে আছে বিচার

রাকিবুল ইসলাম, নরসিংদী | প্রকাশিত: ১ নভেম্বর ২০২১ ০১:০২; আপডেট: ১ নভেম্বর ২০২১ ০১:০৩

নরসিংদীর সাবেক পৌর মেয়র ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর আজ। ২০১১ সালের ১ নভেম্বর তাকে নরসিংদী সদরে দলীয় কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর অতিবাহিত হলেও থমকে আছে বিচারকাজ। হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত বছর পর ২০১৯ সালের শুরুর দিকে উচ্চ আদালতের নির্দেশে মামলার অভিযোগপত্রের ওপর বাদীর দায়ের করা নারাজি আবেদন আদালত গ্রহণ করে পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।

আদালত পুনঃতদন্তে শুধুমাত্র বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করেন। এ ঘটনায় রিভিশন চেয়ে বাদী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আবেদন করেন। করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন আদালতের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা থাকায় তা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে লোকমান হোসেনের ১০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জনবন্ধু শহীদ লোকমান পরিষদ। তারা প্রয়াত লোকমান হোসেনের সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দোয়া মাহফিল, গণভোজ ও বিনামূল্যে চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

মামলার বাদী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০১১ সালের ১ নভেম্বর পৌর মেয়র লোকমান হোসেনকে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।

এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই নরসিংদী শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান কামরুল বাদী হয়ে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর ছোট ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে প্রধান আসামি করে ১৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তৎকালীন জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামুনুর রশীদ মন্ডল ৮ মাস তদন্ত শেষে ২০১২ সালের ২৪ জুন সালাহউদ্দিনসহ এজাহারভুক্ত ১১ আসামিকে বাদ দিয়ে ১২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন।

এতে মামলার এজাহারভুক্ত তিন নম্বর আসামি শহর আওয়ামী লীগের সাবেক কোষাধ্যক্ষ মোবারক হোসেন, এজাহারভুক্ত দুই নম্বর আসামি নরসিংদী পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি আবদুল মতিন সরকার, তার ছোট ভাই শহর যুবলীগের সাবেক সভাপতি আশরাফুল ইসলাম সরকারসহ ১২ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

এদিকে অভিযোগপত্র দাখিলের আগেই মোবারক হোসেন ছাড়া সবাই আদালতের মাধ্যমে জামিনে বের হয়ে যান। দীর্ঘ সাত বছর পর গত ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর মোবারক হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনিও বর্তমানে জামিনে মুক্ত রয়েছেন। সম্প্রতি চার্জশিটভুক্ত আসামি আবদুল মতিন সরকার দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর মারা গেছেন।

অন্যদিকে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ২০১২ সালের ২৪ জুলাই নরসিংদীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নারাজি দেন মামলার বাদী মো. কামরুজ্জামান কামরুল। আদালত ২৫ জুলাই নারাজি আবেদন খারিজ করে অভিযোগপত্র বহাল রাখেন। পরবর্তীতে ২৮ আগস্ট নারাজি আবেদন খারিজের বিরুদ্ধে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন বাদী।

আদালত ২ সেপ্টেম্বর সেই আবেদন গ্রহণ করে ৪ নভেম্বর শুনানি শেষে ফের নারাজি আবেদন খারিজ করেন। এরপর উচ্চ আদালতে যান বাদী। তিনি অভিযোগপত্র বাতিল করে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়ে নিম্ন আদালতে বিচারকার্য স্থগিত রাখতে রিট পিটিশন দাখিল করেন। হাইকোর্ট বাদীর আবেদন আমলে নিয়ে নিম্ন আদালতে বিচারকার্য স্থগিত করে দেন।

এ ঘটনায় জামিনে বের হয়ে আসামিরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মামলার কার্যক্রম স্থগিত রাখতে রিট পিটিশন দাখিল করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে শুনানির অপেক্ষায় থাকার পর আদালত ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি আসামিদের করার রিট পিটিশনটি নিষ্পত্তি করে বাদীর নারাজি আবেদন গ্রহণ করতে এবং বাদী ও সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন।

২০১৯ সালের ২৫ জুন নরসিংদী জজ আদালতের মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. রকিবুল ইসলাম শুধু বাদী কামরুজ্জামানের জবানবন্দি গ্রহণ করেন। পরে বাদী জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। করোনা মহামারির কারণে আদালতের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা থাকায় তা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আসাদ আলী বলেন, দীর্ঘ প্রায় সাত বছর পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে অভিযোগপত্রের ওপর বাদীর দায়ের করা নারাজি আবেদন আদালত গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে তা শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

মামলার বাদী সাবেক পৌর মেয়র কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রটি সঠিক ছিল না। সেখানে অভিযুক্ত ১৪ আসামির মধ্যে ১১ আসামিকেই বাদ দেওয়া হয়েছিল। যতদিন পর্যন্ত প্রকৃত আসামিদের বিচারের আওতায় না আনা হবে ততদিন আমরা আইনি লড়াই করে যাব। বিচার কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। তাই আমরা সুষ্ঠু বিচার নিয়ে শঙ্কায় আছি।

নিহত লোকমান হোসেনের স্ত্রী সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য তামান্না নুসরাত বুবলী বলেন, আধুনিক নরসিংদীর রূপকার মেয়র লোকমান হোসেন। তার জীবনে জনপ্রিয়তাই কাল হয়েছে। সন্ত্রাসীরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। দীর্ঘদিনেও সুষ্ঠু বিচার না পাওয়ার কষ্ট আমারসহ পুরো নরসিংদীবাসীর। তাই আমি মহান সংসদে তা উপস্থাপন করেছি। আশা করছি খুব দ্রুত আমরা সুষ্ঠু বিচার পাব।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top