ঢাকা রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮

ভ্রাম্যমাণ ছিনতাইকারীদের ‘গাড়ি গ্রুপ’

নিজস্ব প্রতিবেদক: | প্রকাশিত: ১০ মে ২০২১ ২৩:০৭; আপডেট: ২০ জুন ২০২১ ১৯:০৩

পথচারীদের গাড়িতে তুলে নিয়ে ছিনতাই করতো ওরা
 
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে বিহারি ক্যাম্পের একটি মোটরবাইক সার্ভিসিংয়ের দোকানে গত ১০ এপ্রিল দুপুরে নিজের বাইকটি সার্ভিসিং করাতে দিয়ে রিকশাযোগে তেজগাঁওয়ে নিজের বাসায় ফিরছিলেন মশিউর রহমান রাসেল। রিকশাটি রেসিডেন্সিয়াল স্কুল ও কলেজের পেছনের গেট পার হয়ে একটু সামনে যেতেই, রাসেলের হাতে থাকা ল্যাপটপের ব্যাগটি টান দিয়ে নিয়ে যায় একটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ছিনতাইকারী।  তিনি রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে হাত ও পায়ে ব্যথা পান। সঙ্গে সঙ্গে তিনি দৌড়ে ছিনতাইকারীদের অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। তবে তাদের নাগাল পাননি।

মশিউর রহমান রাসেল পরে মোহাম্মদপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ছিনতাইয়ের বেশিরভাগ ঘটনায়ই মামলা হয় না। ভুক্তোভোগীরা নিজেরাই মামলা করতে রাজি হন না।

 

ঢাকা মহানর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যানুযায়ী, গত এপ্রিলে ঢাকায় ১৩টি বড় ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ডিএমপির তথ্য বলছে, জানুয়ারিতে ১৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ৮টি, মার্চে ৮টি এবং এপ্রিলে ১৩টি ছিনতাই বা দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। এক সময় সড়কে মানুষজনকে ঠেক দিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও গত কয়েক বছরে ছিনতাইয়ের ধরন পাল্টেছে। এখন মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস নিয়ে ছিনতাই করা হয়। এসব ছিনতাইকারীরা ভ্রাম্যমাণ।

 যাত্রাবাড়ী থেকে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার দুই ছিনতাইকারী

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানিয়েছে, বর্তমানে ছিনতাইকারীরা ‘ভ্রাম্যমাণ’ হয়ে ঘুরে বেড়ায়। তারা মোটরসাইকেল, সিএনজি, প্রাইভেটকার বা মাইক্রোবাস নিয়ে বের হয়। কখনও যাত্রী হিসেবে তুলে তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। আবার যাত্রীরা কিছু দিতে না চাইলে কখনও কখনও তাদের শ্বাসরোধে হত্যা করে কোনও নির্জন সড়কের পাশে ফেলে রেখে ছিনতাইকারীরা চলে যায়।

গত ৬ মে ভোর ৫টার দিকে রাজধানীর খিলক্ষেত ফ্লাইওভারের ওপর থেকে গলায় গামছা পেঁচানো অবস্থায় সুভাস চন্দ্র সুত্রধর (৩৬) নামে এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি দুবাই প্রবাসী ছিলেন। তার বাড়ি বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের সুধীর চন্দ্র সুত্রধর ও সুমিত্রা রানীর ছেলে।

প্রবাসী সুভাষ চন্দ্র সুত্রধরের ভায়েরা ভাই কৃষ্ণ বাবু জানিয়েছেন, সুভাস দুবাই প্রবাসী ছিলেন। ছুটিতে গত নভেম্বরে দেশে আসেন। এরই মধ্যে বিয়ে করেছেন তিনি। এ মাসেই আবারও তার দুবাই যাওয়ার কথা ছিল। বুধবার (৫ মে) তিনি মাইক্রোবাসযোগে ঢাকা আসছিলেন, টিকিট কনফার্ম করা ও করোনা টেস্টের জন্য। সুভাষের কাছে টিকিটের টাকাসহ প্রায় ৭০ হাজার টাকা ছিল। সেই টাকা কিছুই পাওয়া যায়নি।

খিলক্ষেত থানার এসআই শাহিনুর রহমান জানান, মৃতের গলায় গামছা পেঁচানো ছিল। পুলিশের ধারণা ছিনতাইকারীরা তাকে হত্যা করে টাকা-পয়সা নিয়ে লাশ ফ্লাইওভারের ওপরে রেখে পালিয়ে গেছে।

ছিনতাইকারীদের কাছ থেকে জব্দ করা ছুরি ও মোবাইল ফোনএভাবে নৃশংস হয়ে উঠেছে ছিনতাইকারীরা। প্রায়ই এভাবে সড়কে, ফ্লাইওভারে, সড়কের পাশের ঝোপে ও ঝিলে লাশের দেখা মেলে। একের পর এক প্রাণহানি ঘটলেও ছিনতাইকারীদের ঠেকাতে পারছে না পুলিশ। ভুক্তভোগীরা বলছেন, ছিনতাইকারীদের এখন দিন আর রাত নেই। নির্ভয়ে তারা গাড়ি ও মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ পেলেই অন্যের ব্যাগ ধরে টান দেয়। কোথাও কোথাও পুলিশের নামমাত্র তল্লাশি চৌকি থাকলেও সেগুলো কাজ করে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ছিনতাই ঠেকাতে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রতিটি মাসিক সভায় আলোচনা করেন কমিশনার। ছিনতাই বন্ধে টহল পুলিশের কার্যক্রম জোরদার করাসহ বিভিন্ন ক্যাম্প ও ফাঁড়িগুলোকেও আরও সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। তবে ছিনতাইকারীরা অপ্রতিরোধ্য।

গত ৫ মে ভোর ৬টার দিকে কমলাপুর এলাকায় প্রাইভেটকারে থাকা ছিনতাইকারীর হ্যাঁচকা টানে রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে সুনিতা রানী দাস (৫০) নামে এক নারী মারা যান। ঘটনার সময় সঙ্গে তার নাতি ছিল। ছিনতাইকারীরা সুনিতার ব্যাগ ধরে এত জোরে টান দেয় যে, তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইয়াসিন আরাফাত খান বলেন, ‘পুলিশ প্রাইভেটকারটিকে শনাক্ত এবং ছিনতাইকারীদের আটক করার চেষ্টা করছে। আমরা মামলাটি তদন্ত করছি।’




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top