ঢাকা রবিবার, ২০ জুন ২০২১, ৬ আষাঢ় ১৪২৮

করোনাকালে তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ই-সার্ভিসের অনন্য ভূমিকা

মনিরুজ্জামান উজ্জ্বল , | প্রকাশিত: ১০ মে ২০২১ ০১:৪২; আপডেট: ২০ জুন ২০২১ ১৭:৫২

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) নামের এক অভিশাপে মৃত্যুপুরী গোটা বিশ্ব। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ইতালি, ব্রাজিল এবং ভারতের মতো দেশগুলোতে এই ভাইরাসের তাণ্ডব আগের সব মহামারিকে ছাড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশেও ভয়াল ছোবল দিয়েছে ভাইরাসটি। আক্রান্ত হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। প্রাণ ঝরেছে হাজার হাজার।

তবে উন্নত দেশগুলোতে, এমনকি প্রতিবেশী ভারতেও যেভাবে এ ভাইরাস লাশের সারি ফেলেছে, বাংলাদেশ সে তুলনায় এখন পর্যন্ত কিছুটা হলেও স্বস্তির জায়গায় আছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। তারা এক্ষেত্রে ভাইরাস মোকাবিলায় ঘোষিত সাধারণ ছুটি বা লকডাউন, চিকিৎসাসেবাসহ সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপকে কৃতিত্ব দিচ্ছেন। পাশাপাশি জনসচেতনতা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও পাচ্ছে বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা। 

করোনা ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সারাদেশের কোন সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে কত সংখ্যক শয্যা খালি রয়েছে, কোথায় গেলে সেবা পাওয়া যাবে তা সহজেই জানতে পারছেন রোগী ও তার স্বজনরা। করোনা শনাক্তে নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে করোনার আরটি-পিসিআর ল্যাব টেস্টের ফলাফল মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ২৪/৭ হটলাইন, ই-মেইল এবং অভিযোগ পোর্টালের মাধ্যমে জনসাধারণ সরাসরি ফোন করে প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন

এই মহামারিকালে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যখাত বিশেষত চিকিৎসাসেবায় ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ই-সার্ভিস অনন্য ভূমিকা পালন করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য ও রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে, যে কোনো মহামারি নিয়ন্ত্রণে তথ্য ব্যবস্থাপনা অন্যতম প্রধান অংশ। যে প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি ও সামগ্রিক রোগ নজরদারির তথ্য, নিয়মিত রিপোর্টিং, রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, রোগ পর্যবেক্ষণ ও রিসোর্স ম্যাপিং করা হয়। করোনার প্রকোপের শুরু থেকেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সার্ভিস (এমআইএস) শাখার নেতৃত্বে তথ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম চলছে দক্ষতার সঙ্গে। ফলে বিভ্রান্তি-গুজব প্রতিরোধ করে গড়ে তোলা গেছে জনসচেতনতা, যা মহামারি মোকাবিলায় দিচ্ছে আশাব্যঞ্জক ফল।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) একটিমাত্র আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরিতে এ ভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা হতো। পর্যায়ক্রমে বাড়তে বাড়তে এখন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ১২৭টি আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরি, ৩৫টি জিন এক্সপার্ট, ২৬৬টি র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট ল্যাবরেটরিসহ মোট ৪২৮টি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, গত ৬ মে পর্যন্ত দেশে ৫৫ লাখ ৮২ হাজার ২৬৩টি নমুনা পরীক্ষা করে সাত লাখ ৬৯ হাজার ১৬০ জন করোনা রোগী শনাক্ত হয়। ভাইরাসটিতে ৬ মে পর্যন্ত ঝরে যায় ১১ হাজার ৭৯৬ প্রাণ। একই সময়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন সাত লাখ দুই হাজার ১৬৩ জন।

দেশের প্রতি ১০ লাখ জনসংখ্যায় চার হাজার ৫১৬ দশমিক ৩৩ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন ৬৯ দশমিক ২৬ জন। সুস্থ হয়েছেন চার হাজার ১২২ দশমিক ৯৪ জন। করোনার শুরু থেকে ৬ মে পর্যন্ত বিমান, সমুদ্র, স্থলবন্দর ও রেলস্টেশনে ২১ লাখ ২৮ হাজার ২২৮ জন বিদেশফেরত যাত্রীর হেলথ স্ক্রিনিং হয়। এর মধ্যে সাত লাখ ১৯ হাজার ৬৪৪ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক ও হোম কোয়ারেন্টাইনে নেয়া হয় এবং এক লাখ ২৫ হাজার ১২৩ জন সন্দেহভাজন করোনা রোগীকে রাখা হয় আইসোলেশনে।

করোনাকালের শুরু থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের কাছে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের চিকিৎসাসেবাকে সহজলভ্য করা সম্ভব হয়েছে

 

বর্তমানে সারাদেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য ১২ হাজার ৪৮টি সাধারণ শয্যা ও এক হাজার ৭২টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১৫টি করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে তিন হাজার ৪৪৪টি সাধারণ শয্যা, ২৬২টি আইসিইউ শয্যা, হাইফ্লো নেজাল ক্যানুলাসহ আইসিইউ সমতুল্য ৪৭৪টি শয্যা এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটরসহ ২২৪টি শয্যা রয়েছে। বেসরকারি ২৭টি হাসপাতালে এক হাজার ৮৯৮টি সাধারণ শয্যা ও ৫০০টি আইসিইউ শয্যা, হাইফ্লো নেজাল ক্যানুলাসহ আইসিইউ সমতুল্য ৩৫৭টি শয্যা এবং অক্সিজেন কনসেনট্রেটরসহ ১০৮টি শয্যা রয়েছে।

মহামারির প্রথম ধাক্কা
২০১৯ সালের ডিসেম্বর। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয়। প্রথমদিকে চীন কর্তৃপক্ষই এটিকে আমলে নেয়নি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ না ঘুরতেই পুরো প্রদেশ ছাড়িয়ে চীনকেই কাঁবু করে ফেলে ভাইরাসটি। এরপর ধীরে ধীরে সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে থাকে করোনা। ২০২০ সালের ১১ মার্চ করোনার সংক্রমণকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

সরকার করোনা রোগীদের চিকিৎসায় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল স্থাপন, বিপুল সংখ্যক ডাক্তার ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী লাখ লাখ করোনার নমুনা পরীক্ষাসহ চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেছে। এক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে

বাংলাদেশ শুরু থেকেই করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ন্যাশনাল প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স প্ল্যান ফর কোভিড-১৯ প্রণয়ন করে। করোনা প্রতিরোধে ৩১ দফা নির্দেশনার আলোকে পরিকল্পনায় প্রথমে তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। বিদেশ থেকে করোনাভাইরাসের আগমন নিয়ন্ত্রণ, দেশের মধ্যে করোনা এসে পড়লে তার বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রান্তদের চিহ্নিতকরণসহ তাদের পৃথক করে চিকিৎসা প্রদান।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এরপর ১৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগীর মৃত্যু হয়। ক্রমে সম্পূর্ণ অপরিচিত এ রোগের সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়তে থাকে। এতে দেশের সাধারণ জনগণ তো বটেই, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত শীর্ষ কর্মকর্তারাও আতঙ্কিত, হতবিহ্বল এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।

সিলেটে করোনা আক্রান্ত ডা. মঈন উদ্দিন আহমদকে ঢাকায় আনার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এরপর খোদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের চিকিৎসক, নার্স, ওয়ার্ডবয় ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আরও বেশি চেপে বসে। এর মধ্যে আবার হাসপাতালে কর্তব্যরতদের জন্য পর্যাপ্ত এন-৯৫ মাস্ক ও পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুপমেন্ট) মিলছিল না। রোগ শনাক্তের জন্য শুধু রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ছাড়া ছিল না প্রয়োজনীয় সংখ্যক আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরি। হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন যেমন ছিল না, তেমনি মারাত্মক সঙ্কট দেখা দেয় আইসিইউ শয্যার। এছাড়া সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে হাসপাতালে রোগীকে স্বজনদের ফেলে যাওয়া, মৃত রোগীর লাশ দাফনে বাধা দেয়াসহ নানা ঘটনা গোটা দেশবাসীকে চরম আতঙ্কে ফেলে দেয়।

এ অবস্থায় ২৬ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিন চলে লকডাউন। মানুষ হয়ে পড়ে ঘরবন্দি। সরকারের সর্বোচ্চ মহল স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণে দফায় দফায় বৈঠক করেন। লকডাউনের কারণে সরকারি অফিস-আদালত প্রায় বন্ধ থাকায় কীভাবে করোনা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ তথা সামগ্রিক পরিস্থিতি সামাল দেয়া যায় তা নিয়েও আলোচনা চলতে থাকে।

এর মধ্যে নেয়া হয় নানা পদক্ষেপ। শুরু হয় ডিজিটাল বিভিন্ন কার্যক্রমও। সেসব পদক্ষেপ-কার্যক্রমই শৃঙ্খলা নিয়ে আসে করোনা প্রতিরোধ কার্যক্রমে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে করোনা সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি অনন্য ভূমিকা পালন করছে। মহামারির শুরুতে ন্যাশনাল কোভিড-১৯ সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম তৈরির মাধ্যমে আগের প্রচলিত ডাটা প্লাটফর্ম ডিএইচআইএস২ ব্যবহার করে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এ পদ্ধতি ব্যবহার করে করোনা সংক্রান্ত সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়।

স্বাস্থ্যখাতে তথ্য ব্যবস্থাপনা ও ই-সার্ভিস যেভাবে ভূমিকা রাখছে
ব্যক্তিপর্যায়ে তথ্যের ক্ষেত্রে সার্ভেইল্যান্স ট্র্যাকার উপজেলায় পর্যন্ত করোনা রোগীর অবস্থান, ল্যাব পরীক্ষার ফল এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তথ্য সরবরাহ করছে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে। পাশাপাশি সমন্বিত তথ্যের ক্ষেত্রে দৈনিক করোনা রোগীর অবস্থা (ল্যাব পরীক্ষা, আক্রান্ত, আইসোলেশন, সুস্থ এবং মৃতের সংখ্যা), বিমান, সমুদ্র এবং স্থলবন্দরসহ বিভিন্ন পয়েন্টে অব এন্ট্রিতে করোনা স্ক্রিনিংয়ের তথ্য এবং হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের সামগ্রিক তথ্য অবহিত করার কাজও চালিয়ে যাচ্ছে।

jagonews24

করোনা-ইনফো নামে ওয়েবসাইট থেকে মিলছে এ মহামারি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য

করোনা সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টাল
মহামারির শুরুতে করোনার মালামাল ব্যবস্থাপনার জন্য সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট পোর্টাল তৈরি করা হয়। এটির মাধ্যমে বিভিন্ন উপকরণভিত্তিক মজুত বিতরণ তথ্য, প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী বিশ্লেষণ এবং প্রোডাকশন টুল সাপ্লাই ম্যানেজমেন্ট সমন্বয় করা হয়।

করোনা ড্যাশবোর্ড
করোনাকেন্দ্রিক বিভ্রান্তি ও গুজব এড়াতে জনসাধারণকে তথ্য জানানোর জন্য তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীয় তথ্য ড্যাশবোর্ড। এই ড্যাশবোর্ডে দেশের করোনা পরিস্থিতির সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওয়েবসাইটে করোনা কর্নার
জনসাধারণকে তথ্য জানাতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওয়েবসাইটে একটি কর্নার তৈরি করা হয়েছে। যেখানে করোনা সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্য, নির্দেশিকা এবং প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারের লিংক নিয়মিতভাবে আপলোড করা হয়।

করোনা-ইনফো ওয়েবসাইট
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রকল্পের অধীন এটুআই’র সহযোগিতায় জনসাধারণের জন্য আরেকটি ওয়েবসাইট তৈরি করা হয়েছে। করোনা-ইনফো নামে ওয়েবসাইটটিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের এ সম্পর্কিত তথ্য, সচেতনতামূলক নির্দেশনা, দৈনিক প্রেস বিজ্ঞপ্তি এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের ব্রিফিংসহ সব হালনাগাদ তথ্য দেখানো হয়। সব সরকারি নির্দেশনা, অডিও-ভিডিও বিজ্ঞাপন, সফটওয়্যার, খাদ্য ও জরুরি সভা এ ওয়েবসাইটে নিয়মিত আপডেট করা হয়।

করোনা আরটি-পিসিআর ল্যাব টেস্টের ফলাফল
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস শাখা ডিএইচআইএস ২ ও সফটওয়্যার প্লাটফর্মের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি অনলাইন ডিজিটালাইজড টেস্ট রিপোর্ট ডেলিভারি সিস্টেম তৈরি করেছে, যেখানে একজন ডাটা অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিএইচআইএস ২ সিস্টেমে পরীক্ষার ফলাফল প্রবেশ করানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে এসএমএসের মাধ্যমে তা চলে যাচ্ছে। এছাড়া ওয়েবসাইট থেকে কিউআর কোড ভেরিফিকেশন ব্যবস্থাসহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রস্তুত করোনাভাইরাস পরীক্ষার মেডিকেল সার্টিফিকেট ডাউনলোড করা যাচ্ছে। মোবাইল এসএমএস, মেডিকেল সার্টিফিকেট উভয়ই স্বাস্থ্য অধিদফতরের অনুমোদিত এবং চিকিৎসা কিংবা অন্য যে কোনো সরকারি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যায়। এমআইএস ডিজিএইচএস শিরোনামে অথবা ০১৭২৯০২৪৬১২ মোবাইল নম্বর থেকে করোনা পরীক্ষার ফলাফলের এসএমএস পাঠানো হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের কাছে।

২৪/৭ হটলাইন, ই-মেইল এবং অভিযোগ পোর্টাল
মহামারির প্রথম থেকেই স্বাস্থ্য অধিদফতর একটি ২৪/৭ (সাত দিন ২৪ ঘণ্টা) করোনাবিষয়ক কন্ট্রোল রুম পরিচালনা করছে, যেখানে জনসাধারণ সরাসরি ফোন করে প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে। এখানে নিবন্ধনের মাধ্যমে অভিযোগ করলে সেগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য এবং বিভিন্ন অভিযোগের জন্য চালু করা হয় হটলাইন— ০১৩১৩-৭৯১১৩৮, ০১৩১৭৯১১৩৯ এবং০১৩১৭৯১১৪০।

 

করোনাকালে স্বাস্থ্য বাতায়ন নামে হেলথ কল সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে

এছাড়া জনসাধারণের জন্য ল্যাবরেটরির পরীক্ষার ফলাফল সার্টিফিকেট সংশোধন সম্পর্কে অভিযোগ এবং অনুরোধ করার জন্য আরেকটি ই-মেইল ঠিকানা তৈরি করা হয়। ই-মেইল ঠিকানাটি হলো: covidcertificate@mis.dghs.bd।

২৪/৭ হটলাইন সিস্টেম ছাড়াও এমআইএস বিভাগ একটি অভিযোগ পোর্টাল তৈরি করেছে, যেখানে রোগী যে কোনো প্রশ্ন করতে পারেন এবং সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে কোনো অভিযোগ জমা দিতে পারেন।

২৪/৭ টেলিমেডিসিন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টার
করোনাকালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস শাখার মাধ্যমে স্বাস্থ্য বাতায়ন নামে ন্যাশনাল হেলথ কল সেন্টার পরিচালিত হচ্ছে, যার ডায়াল কোড ১৬২৬৩। এটি টেলিমেডিসিন সেবা এবং এ সম্পর্কিত অন্যান্য তথ্যের জন্য জাতীয় হটলাইন হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। গত এক বছরেরও বেশি সময়ে স্বাস্থ্য বাতায়নে (১৬২৬৩) এক কোটি ১৮ লাখ ৭০ হাজার ৯৯ জন কল করে সেবা নিয়েছেন।

এছাড়া ৩৩৩ নম্বরে এক কোটি ৫৫ লাখ ২২ হাজার ৬৬৭ জন এবং আইইডিসিআরের (১০৬৫৫) নম্বরে তিন লাখ ৭৩ হাজার ১৬২ জন কল করেছেন।

ভলান্টিয়ার ডক্টরস পুল বিডি
করোনাকালে প্রায় সাড়ে চার হাজার স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকের অংশগ্রহণে‘ভলান্টিয়ার ডক্টরস পুল বিডি’ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে জনগণকে করোনা সম্পর্কিত স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। এ স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য অধিদফতরের ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন অনুযায়ী বিশেষ অনলাইন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।

এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে, গত বছরের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত মোট দুই লাখ ৪৭ হাজার ৮৬১ জন নাগরিক এই পুলের সেবা গ্রহণ করেন।

অন্যান্য টেলিমেডিসিন সেবা
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি টেলিমেডিসিন প্লাটফর্ম ১৬২৬৩ এবং ৩৩৩ ছাড়াও বেসরকারিভাবে ২৭টি টেলিমেডিসিন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ৫৯০ জনেরও বেশি প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে এক লাখেরও বেশি নাগরিককে এই মহামারিকালে স্বল্পমূল্যে সেবা প্রদান করেছে। এখনো অনেক প্লাটফর্ম এভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

`প্রবাস বন্ধু’ কল সেন্টার
করোনাকালে স্বাস্থ্যসেবা দিতে চালু হয় ‘প্রবাস বন্ধু’ কল সেন্টার। এর মাধ্যমে সৌদি আরবে বসবাসকারী তিন হাজারেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বাহরাইনে বসবাসরত এক হাজার প্রবাসী বাংলাদেশিকে চিকিৎসা সংক্রান্ত পরামর্শ দেয়া হয়।

জোনভিত্তিক তথ্য
এই দুঃসময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের কাজ ছিল করোনা আক্রান্ত রোগী ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ। সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর রোগীর অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে অঞ্চলভিত্তিক উচ্চ ঝুঁকি, কম ঝুঁকি এবং নিরাপদ এলাকা (লাল, হলুদ এবং সবুজ) মানচিত্রে চিহ্নিত করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তথ্য দেয়।

স্ক্রিনিং, ডাটা অ্যানালাইসিস এবং অ্যাপস
করোনার বিস্তার ঠেকাতে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তৈরি মোবাইল ফোনভিত্তিক সেলফ স্ক্রিনিং এবং ঝুঁকি নির্ণয় সংক্রান্ত অফিশিয়াল ২৫টির বেশি ওয়েব এবং মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। প্রায় দেড় লাখ মানুষ সেলফ স্ক্রিনিং টুলের মাধ্যমে নিজেদের সন্দেহভাজন করোনাবাহক হিসেবে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছেন।

করোনা সংক্রান্ত কলারদের তথ্য থেকে বিগ ডাটা অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে এক লাখ ৬৫ হাজার সন্দেহভাজন রোগী খুঁজে বের করা হয়। পরে স্বেচ্ছাসেবী চিকিৎসকদের মাধ্যমে পরিচালিত স্ক্রিনিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ৪৫ হাজার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রোগী চিহ্নিত করা হয় এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরে পরীক্ষার জন্য তাদের নমুনা পাঠানো হয়।

 

‘সুরক্ষা’ অ্যাপসের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে করোনার ভ্যাকসিন প্রয়োগ কার্যক্রম

মিডিয়া সেল
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এমআইএস বিভাগের অধীনে একটি মিডিয়া সেল তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে করোনা সম্পর্কে যাচাইকৃত সঠিক তথ্য এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত তথ্য প্রদান করা হচ্ছে। মিডিয়া সেলের হটলাইন নম্বর ০১৭৫৯-১১৪৪৮৮ এবং ই-মেইল ঠিকানা: mediacell@mis.dghs.bd

‘সুরক্ষা’ অ্যাপসের মাধ্যমে করোনার ভ্যাকসিন প্রদান
দেশের জনগণকে সুরক্ষিত রাখতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়ে এসেছে সরকার। এই টিকা প্রদান কার্যক্রম সফলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে ‘সুরক্ষা’ নামে অ্যাপসে নিবন্ধনের মাধ্যমে।

গত ২৭ জানুয়ারি দেশে প্রথম পরীক্ষামূলক টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর প্রথম দফায় কয়েকশ মানুষকে পরীক্ষামূলকভাবে টিকা দেয়া হয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীসহ সারাদেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। ৬ মে পর্যন্ত প্রথম ডোজের টিকা নিয়েছেন ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৮৫৪ জন এবং দ্বিতীয় ডোজের টিকা নিয়েছেন ৩৩ লাখ ১৩ হাজার ৪২৪ জন। টিকাগ্রহণকারীরা এখন ডিজিটাল পদ্ধতিতে টিকার সনদও পাচ্ছেন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সার্ভিসের (এমআইএস) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মিজানুর রহমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘করোনাকালের শুরু থেকেই তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের কাছে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের চিকিৎসাসেবাকে সহজলভ্য করা সম্ভব হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘করোনা ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে দেশের কোন সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালে কত সংখ্যক শয্যা খালি রয়েছে, কোথায় গেলে সেবা পাওয়া যাবে তা সহজেই জানতে পারছেন রোগী ও তার স্বজনরা। করোনা শনাক্তে নমুনা সংগ্রহের মাধ্যমে করোনার আরটি-পিসিআর ল্যাব টেস্টের ফলাফল মোবাইল মেসেজের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। ২৪/৭ হটলাইন, ই-মেইল এবং অভিযোগ পোর্টালের মাধ্যমে জনসাধারণ সরাসরি ফোন করে প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছেন। অভিযোগ সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। করোনাকালে লোকজনকে ঘরে বসে চিকিৎসাসেবা প্রদানে ২৪/৭ টেলিমেডিসিন অ্যান্ড ইনফরমেশন সেন্টার চালু রয়েছে।’

ডা. মিজানুর রহমান জানান, সুরক্ষা অ্যাপসের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে আইসিটি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করোনার ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে। সর্বোপরি করোনা মহামারির ভয়াল থাবায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হ্রাস ও মৃত্যুরোধে তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং ই-হেলথ অনন্য ভূমিকা পালন করছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘করোনার সংক্রমণরোধে চিকিৎসাসেবা এবং স্বাস্থ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্তঃযোগাযোগ স্থাপনে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ডিজিটাল পদ্ধতি। সরকারিভাবে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের মতো সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনা গেলে সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ তথা চিকিৎসাসেবা প্রদান আরও সহজতর হতো।’

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (সহকারী পরিচালক) ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ‘২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ৮ মে ২০২১ পর্যন্ত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রায় ১৩ লাখ যাত্রী এসেছেন। করোনাকালে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী যাত্রীদের হোম ও প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়। ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে অনলাইনে প্রত্যেক যাত্রীর তথ্য সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের জানানো হয়। তারা তাদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করেন। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইন সেন্টারগুলোতেও অনলাইনে তথ্য পাঠানো হয়। এ পদ্ধতিতে সামগ্রিক কার্যক্রম সহজ হয়েছে।’

সার্বিক বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে করোনার জরুরি স্বাস্থ্য সঙ্কট মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সরকার করোনা রোগীদের চিকিৎসায় করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল স্থাপন, বিপুল সংখ্যক ডাক্তার ও নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দিয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী লাখ লাখ করোনার নমুনা পরীক্ষাসহ চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেছে। ফলে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো। এক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top