ঢাকা মঙ্গলবার, ৪ অক্টোবর ২০২২, ১৮ আশ্বিন ১৪২৯

আসামির নাম জামাল, গ্রেফতার হলেন কামাল!

আমির হোসেন স্মিথ, নারায়ণগঞ্জ | প্রকাশিত: ৫ মার্চ ২০২১ ২০:৪৯; আপডেট: ৪ অক্টোবর ২০২২ ০২:০৯

 
 

জামাল নামের এক ব্যক্তিকে আদালত মাদক মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। তাকে গ্রেফতারের পরোয়ানায় নামের ‘জ’ অক্ষরটি ওভাররাইট করে ‘ক’ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এরপর কামাল নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে নারায়ণগঞ্জ সদর থানা পুলিশ। কামাল হোসেন আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একজন মেম্বার প্রার্থী। কামাল হোসেনের অভিযোগ, নির্বাচনে সুবিধা পেতে তার প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থী সদর থানার ওসি, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমানসহ চার পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে জামাল হোসেনকে গ্রেফতার না করে কেন কামাল হোসেনকে গ্রেফতার করা হলো সে সম্পর্কে ব্যবস্থা নিতে বলেছে আদালত। তবে আদালতের আদেশের দুইদিন পরেও সে কাগজ পাননি বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার।

ভূক্তভোগী নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার গোগনগর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামাল হোসেন জানান, ২০১৯ সালের ২০ নভেম্বর কুমিল্লার একটি আদালতে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আলমগীর হোসেন ও জামাল হোসেন নামের দু’জনকে দুই বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড এবং ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। দণ্ডিতদের মধ্যে আলমগীরের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দি, সে ওই এলাকার মো. আলীর ছেলে। মামরার অপর আসামি জামাল হোসেন নারায়ণগঞ্জের চর সৈয়দপুরের সুরুজ মিয়ার ছেলে। দণ্ডিতদের মধ্যে জামাল হোসেন রায় ঘোষণার সময় পলাতক থাকায় তাকে গ্রেফতারের জন্য কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা পাঠানো হয়।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় জামালকে গ্রেফতারের পরোয়ানা পৌঁছার পর পরোয়ানার কাগজে থাকা ‘জামাল’ এর নাম টেম্পারিং করে ‘কামাল’ লিখে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সদর মডেল থানা পুলিশ কামালকে তার বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর কামাল হোসেনকে পুলিশ কুমিল্লা আদালতে পাঠায়। আদালত আসামির জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট যাচাই করে দেখতে পান গ্রেফতারকৃত আসামির নাম কামাল হোসেন। অথচ মাদক আইনে সাজাপ্রাপ্ত প্রকৃত ব্যক্তির নাম জামাল হোসেন। তবে জামাল হোসেন ও নিরপরাধ কামাল হোসেন উভয়ের বাবার নামই সুরুজ মিয়া।

 

আদালত নথি ও কামাল হোসেনের পাসপোর্ট যাচাই করে দেখতে পান, কুমিল্লার যে মামলার রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই কামাল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ওই মামলায় কামাল হোসেন নামের কোনও আসামিই নেই। আর ২০০৯ সালের ২১ এপ্রিল যখন কুমিল্লার কোতয়ালি থানার অরণ্যপুর এলাকা থেকে ৯৫০ কেজি ভারতীয় গাঁজাসহ আলমগীরকে গ্রেফতার করা হয়, ওই সময় কামাল হোসেন দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবাসী ছিলেন।

সদর থানা পুলিশ কামাল হোসেনকে গ্রেফতারের পর তাকে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহামুদুল মোহসীনের আদালতে সোপর্দ করে। ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ কপিতে উল্লেখ রয়েছে, রাষ্ট্র বনাম জামাল হোসেন গং। কিন্তু একই আদেশের নিচের অংশে আসামি হিসেবে কামাল হোসেনের নাম লেখা রয়েছে।

এসব বিষয় বিবেচনা করে কুমিল্লার যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক তাকে জামিন দেন। তবে এর আগেই তাকে ৯ দিন কারাভোগ করতে হয়েছে। আদালত কামালের জামিনের আদেশে বলেন, কামাল হোসেন নামের কোনও আসামি এই মামলায় নেই। জামাল হোসেনের নাম ওভাররাইটিং করে কামাল হোসেন করা হয়েছে। তাই গ্রেফতার কামাল হোসেনকে এই মামলার দায় থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো। কেন জামাল হোসেনকে গ্রেফতার না করে কামাল হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়েছে তা তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারকে বলা হলো।’

জামাল হোসেন জানান, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি মেম্বর পদপ্রার্থী। এ কারণে কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রফিকুল ইসলাম সদর থানার ওসি শাহ্ জামানকে ম্যানেজ করে তাকে গ্রেফতার করিয়েছে বলে তিনি মনে করছেন। তার দাবি, ওসি শাহ জামানকে সহযোগিতা করেছেন ইন্সপেক্টর তদন্ত, এস আই ওয়ালী উল্লাহ ও এস আই মনির।

অভিযোগ সম্পর্ক জানতে চাইলে গোগনগর ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার রফিকুল ইসলাম দাবি করেন, এ ধরনের কোনও ঘটনা বা প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

প্রতিবেশী আওয়ামী লীগ নেতা জসিম উদ্দিন বলেন, কামালেরা ৯ ভাই-বোন। কিন্তু তার অন্য কোনও ভাইয়ের নাম জামাল নেই যে পুলিশ ভুল করে কামালকে গ্রেফতার করেছে বলা যাবে। এমনকি প্রতিবেশীও কারও নাম জামাল নেই। তার দাবি, অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

ভুক্তভোগী কামাল হোসেন আরও জানান, আমরা বিষয়টি জানিয়ে পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। গ্রেফতারের সময় সদর মডেল থানা পুলিশ তার কাছে শুধু তার নাম ও তার বাবার নাম জানতে চেয়েছে। গ্রেফতারি পরোয়ানার কোনও কাগজ দেখায়নি। একটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনে শুধু একটি গ্রেফতারি পরোয়ানার ছবি দেখিয়েছিল।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সদর মডেল থানার ওসি শাহ জামান বলেন, এমনটা হওয়ার কথা না। কেন এমন হয়েছে সেটি তিনি খতিয়ে দেখবেন।

তাকে ম্যানেজ করে বিষয়টি ঘটনো হয়েছে এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসি বলেন, ঘটনার যে তারিখ বলা হচ্ছে ওই সময় আমি ছুটিতে ছিলাম।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম বলেন, এ বিষয়ে এখনও তিনি আদালতের কোনও চিঠি বা আদেশ পাননি। চিঠি পেলে তদন্ত করে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


এই বিভাগের জনপ্রিয় খবর
Top